গত ৬ নভেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে বাকি বিশ্বে যে দেশটি সবচেয়ে বেশি আনন্দে উচ্ছ্বাসিত হয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে ভারত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সম্ভাব্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উচ্ছ্বসিত অভিনন্দন জানাতে ও নতুন সহযোগিতার অঙ্গীকার করতে এক মিনিটও সময় নেননি।
এর ঠিক আড়াই মাস পর ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকার ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন, চার বছরের ব্যবধানে আবার তার ঠিকানা হয়েছে হোয়াইট হাউসে। ‘মাগা’, অর্থাৎ ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ থিমের বিজয়ধ্বনি দিয়ে মুখরিত হয়েছে তার দ্বিতীয় অভিষেক।
কিন্তু ট্রাম্পের জয়ের পর দিল্লিতে যে ধরনের উৎসাহ দেখা যাচ্ছিল এবং বিশেষ করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলো ভারত-মার্কিন সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনার দিকে যা প্রত্যাশা করছিল, তা এখন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেছে। বরং আগামী দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য কিছু পদক্ষেপ নিয়ে দিল্লির ক্ষমতার কেন্দ্রে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মেঘ ক্রমশ ঘনিয়ে উঠছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে দেখা যায়নি, সেখানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সরাসরি মোদিকে ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে ‘পার্সোনাল কেমিস্ট্রি’ নিয়ে ভারতের মিডিয়াতে গত কয়েক বছরে বিশাল পরিমাণ নিউজপ্রিন্ট ও এয়ারটাইম ব্যয় হয়েছে, তারপর আম ভারতীয়দের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা তো বটেই!
বাস্তবিক, ২০২০ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার জন্য লড়াই করছিলেন, তার আগের কয়েক মাসে নরেন্দ্র মোদিই একমাত্র বিশ্বনেতা, যার সঙ্গে তিনি দুটি প্রকাশ্যে জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে টেক্সাসের হিউস্টনে ‘হাউডি মোদি’ অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি তো ট্রাম্পের হাত ধরে ‘আব কি বার ট্রাম্প সরকার’ স্লোগান দিতে দ্বিধা করেননি।
ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিদেশি কোনো নেতার জন্য নির্বাচনী বিজয়ধ্বনি দিচ্ছেন, সেটাও ছিল একটি নজিরবিহীন ঘটনা। আর তার ঠিক মাসপাঁচেকের মধ্যে গুজরাটের আহমেদাবাদে নরেন্দ্র মোদি নিজের নামাঙ্কিত স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের সামনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সংবর্ধনা জানান।
এছাড়া আরও বহুবার নরেন্দ্র মোদির বিখ্যাত ‘হাগ’ বা ‘আলিঙ্গন কূটনীতি’রও স্বাদ পেয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু দুই নেতার মধ্যে তখন যে ধরনের প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব ও মাখামাখি দেখা যেত – গত কয়েক মাসে তা একেবারেই অনুপস্থিত। সেপ্টেম্বরে নরেন্দ্র মোদির আমেরিকা সফরেও দুজনের দেখা হয়নি। নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি তাকে অভিনন্দন জানাতে ফোন করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু এরপর আর তাদের মধ্যে সরাসরি কথাবার্তা হয়েছে বলেও কোনো তথ্য নেই।
আমেরিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানকে নিয়ে গঠিত স্ট্র্যাটেজিক জোট ‘কোয়াড’-এর পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন এই বছরই ভারতে অনুষ্ঠিত হবে – কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে অংশগ্রহণ করবেন কি না, সেটাও এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। ঠিক কোন কারণে ট্রাম্প ২.০ বা দ্বিতীয় ট্রাম্প যুগকে ঘিরে ভারতে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে – এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতের আশার আলো রয়েছে – এই প্রতিবেদনে সেটাই বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ট্যারিফ যুদ্ধ? তেলে নিষেধাজ্ঞা?
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্কতা দিয়েছেন, তার প্রশাসন চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ হারে ‘ট্যারিফ’ বা আমদানি শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা করছে। ‘ট্যারিফ’ প্রকৃতপক্ষে তার অত্যন্ত প্রিয় একটি বাণিজ্যিক হাতিয়ার।
আমেরিকায় বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের চাহিদা হ্রাস করতে এবং বিশ্বের অন্যান্য বাজারে মার্কিন পণ্যের নির্বিঘ্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে তিনি যে এই পদক্ষেপটি গ্রহণ করতে কোনও দ্বিধা করবেন না, সেই সতর্কতা তিনি দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছেন। এই ‘ট্যারিফ যুদ্ধে’ ভারতও তাঁর লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রয়েছে, যাদের তিনি একসময় ‘ট্যারিফ কিং’ বা ‘শুল্ক বসানোর রাজা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, ভারতের মতো এত বেশি আমদানি শুল্ক আর কোনও দেশই আরোপ করে না, কিন্তু তারা আশা করে যে ভারতে উৎপাদিত পণ্য খুব কম ট্যারিফে আমেরিকার বাজারে বিক্রি করতে পারবে!
“যেমন ধরুন, আমাদের হার্লে ডেভিডসন বাইকে ভারত যদি তাদের ১০০ শতাংশ হারে আরোপিত ট্যারিফ কমায় না, তাহলে আমেরিকারও পূর্ণ অধিকার থাকবে ভারতীয় পণ্যে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করার,” ২০১৯ সালের জুনে এই সতর্কতা দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে তিনি এই হুমকির কিছুটা হলেও কার্যকর করবেন বলে ভারতীয় পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই ধারণা।
ভারত ইতোমধ্যেই একটি বৃহৎ বাণিজ্য ঘাটতির (ট্রেড ডেফিজিট) মোকাবেলা করছে। আমেরিকা ভারতের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার, সেখানে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ হলে সেই ঘাটতি যেমন বৃদ্ধি পাবে, ভারতের প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দিল্লির অর্থনীতি বিশ্লেষক ও লেখক স্বামীনাথন আইয়ারের মতে, ‘এটি স্পষ্ট যে আমেরিকাকে মহান বানানোই তাঁর লক্ষ্য, ভারতকে নয়! সুতরাং ভারত যদি তাদের উচ্চ শুল্ক না কমায়, আমেরিকায় বাজারে ভারতের ওপর বৃহৎ ট্যারিফ আরোপ করা একরকম অনিবার্য। আমি নিশ্চিত ট্রাম্প এখানে অন্তত মিথ্যা কথা বলছেন না।”
আইয়ার আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ইরান এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও আমেরিকার সময়কালে আরও কঠোর করা হবে। এটি ভারতের জন্য সুখকর নয়, কারণ গত কয়েক বছরে ভারত যেভাবে রাশিয়া ও ইরান থেকে সস্তায় তেল কিনে এসেছে, সেটাও অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
উল্লেখ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত তিন বছরে রাশিয়া ভারতের প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে, রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে সেই তেল ভারতে রিফাইন করে ইউরোপে রপ্তানি পর্যন্ত করা হচ্ছে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারেও পেট্রল বা ডিজেলের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল পাওয়ার কারণে। কিন্তু এখন পুরো প্রক্রিয়াটি অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ভিসা ছাঁটাই, ডিপোর্টেশন
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছিলেন, আমেরিকার কোম্পানিগুলো যাতে বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ না করে, সেই লক্ষ্যে তিনি এইচ-ওয়ানবি ভিসার সংখ্যা ব্যাপক হারে কমাবেন। এইচ-ওয়ানবি হলো একটি বিশেষ ধরনের নন-ইমিগ্র্যান্ট মার্কিন ভিসা, যার মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানিগুলো আধুনিক বিশেষায়িত প্রযুক্তি বা তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মীদের সাময়িকভাবে নিয়োগ করতে পারে।
গত কয়েক দশকে লাখ লাখ ভারতীয় নাগরিক এই ভিসার মাধ্যমে আমেরিকায় প্রবেশের অনুমতি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স) মতো বিভিন্ন খাতে বর্তমানে কাজ করছেন বা প্রতিষ্ঠিত।
এছাড়া প্রতিবছর যে হাজার হাজার ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান, তাদের ভিসার সংখ্যা হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সহজ করে বললে, ভারতীয় নাগরিকদের আমেরিকায় যাওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন সমস্ত ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রস্তুত বলে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবছর যে হাজার হাজার ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান, তাদের ভিসার সংখ্যা হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সহজ করে বললে, ভারতীয় নাগরিকদের আমেরিকায় যাওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন সমস্ত ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রস্তুত বলে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবছর যে হাজার হাজার ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান, তাদের ভিসার সংখ্যা হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সহজ করে বললে, ভারতীয় নাগরিকদের আমেরিকায় যাওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন সমস্ত ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রস্তুত বলে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, সঠিক কাগজপত্র ছাড়া আমেরিকায় পৌঁছানো কয়েক লাখ ভারতীয়র ভবিষ্যতও এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ২০২৪ সালে পিউ রিসার্চের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আমেরিকায় ‘আনডকুমেন্টেড ইমিগ্র্যান্ট’ বা কাগজপত্রবিহীন বিদেশি অভিবাসীদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা ৭২৫,০০০। ভারতীয় জনগণ এখানে তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী, মেক্সিকো ও এল সালভাদোরের পরেই!
অভিবাসনের ক্ষেত্রে অনেক শিথিল মনোভাব দেখানো বাইডেন প্রশাসনের সময়েও ২০২৪ সালে প্রায় দেড় হাজার ভারতীয়কে আমেরিকা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এখন ট্রাম্পের শাসনের সময় এই বহিষ্কারের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে আরও বাড়বে, যা দিল্লির নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
আইনি জটিলতার ক্ষেত্রগুলি
গত বছর প্রেসিডেন্ট বাইডেনের আমলে নিউইয়র্কে একজন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার (গুরপতওয়ন্ত সিং পান্নু) হত্যার চেষ্টার অভিযোগে ভারতের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করা হয়, তা দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। মার্কিন আদালতে সেই মামলা এখনও চলমান।
আমেরিকায় ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সুশান্ত সিং জানিয়েছেন, এই মামলার বিষয়ে আমেরিকাকে প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে তাদের ‘ফাইভ আইজ’ অংশীদার কানাডা। আর কানাডার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অধ্যাপক সিং আরও জানান, ভারতের হিন্দুত্ববাদী পরিবেশে অনেকের ধারণা ছিল ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এ ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে একটি ‘ডিল’ বা গোপন সমঝোতা করবে এবং এই আইনি মামলাটি থেকে দিল্লিকে মুক্তি দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ট্রাম্প মানবাধিকার বিষয়ক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে হরমিত ধিলোঁকে নিয়োগ করলেন, যিনি ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই সোচ্চার। ভারতে কৃষক আন্দোলনের সময় তিনি পুলিশের কার্যকলাপের নিন্দা করেছিলেন। কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার পর তিনি প্রকাশ্যে মোদি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
AD8
ভারতে বর্তমানে যে মামলা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে, তা হলো আমেরিকায় ভারতীয় শিল্পপতি গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ। আদানিকে প্রধানমন্ত্রী মোদির অন্যতম ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আদানির সম্পর্ক নিয়ে ক্রমাগত আক্রমণ করে আসছেন, যার ফলে বিজেপিকে এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হতে হয়েছে।
এছাড়া, আদানি বিতর্কের প্রেক্ষিতে বিজেপি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছে যে 'মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভারতকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত'। প্রধানমন্ত্রী মোদির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি, এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিজেপির মন্তব্যের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বাংলাদেশ ইস্যুতে ‘নাক গলানো’ কমবে কি ?
প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শাসনকালে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বারবার সংঘাতের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার সরকারের সময়কে দিল্লি ‘স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল’ বাংলাদেশ হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে, কিন্তু এই মূল্যায়নের সঙ্গে আমেরিকার মতামত কখনোই মিলে না।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর প্রতি তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যা ভারতের সঙ্গে তাদের মধ্যে বিরোধের কারণ হয়েছে। গত অগাস্টে ঢাকায় নাটকীয় ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
তবে ভারত এখন আশাবাদী যে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকার ‘অতিরিক্ত মনোযোগ’ অনেকটাই কমে যাবে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট দেশের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশাসন হয়তো তেমন উদ্বিগ্ন হবে না।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে দিল্লিতে মন্তব্য করেন, “আমরা সম্ভবত একটি নতুন যুগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এবার আমেরিকা তার নিজস্ব স্বার্থের দিকে নজর দিয়ে বিদেশনীতি নির্ধারণ করবে এবং বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি নিয়ে অতটা চিন্তা করবে না।”
এ কারণে বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকার মনোভাব অনেকটাই নিস্পৃহ হতে পারে, যা ভারতকে পূর্বের মতো প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেবে বলে দিল্লির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। ওয়াশিংটনে নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়ালজের সঙ্গে তার প্রথম বৈঠকে এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন।
বুধবার ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাসে এক সাংবাদিক সম্মেলনে একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “
বাংলাদেশ সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসন প্রথম দিন থেকেই ভারতের সুরে কথা বলবে, এমন ধারণা করা উচিত নয় বলে মনে করেন জেএনইউ-তে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজ। তিনি মন্তব্য করেন, “কাল থেকেই বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো মতভেদ বা দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকবে না - ভারতও এ বিষয়ে বিশেষ কিছু আশা করছে বলে মনে হয় না। তবে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে ভারত গত কিছুদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে, এবং বাংলাদেশের মাটিতে সম্প্রতি ভারত-বিরোধী কার্যকলাপের কারণে দিল্লি উদ্বিগ্ন, সেক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলেই আশা করা হচ্ছে।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তিন দিন আগে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বর্তমানে তিনি আমেরিকায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিন্দু ভোটারদের একটি বিশাল অংশের সমর্থন অর্জন করেছেন।
বাইডেন প্রশাসনের সময় বাংলাদেশ নিয়ে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে মতবিরোধ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে এটি আর নিচে নামার সম্ভাবনা নেই। ট্রাম্পের প্রশাসনে এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলেই দিল্লির ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।
সম্পর্কের দিকটি কেমন হবে ?
চার দিনের ব্যস্ত সফর শেষে বুধবার দেশে ফেরার আগে জয়শঙ্করকে ভারতীয় এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রথম সারিতে, ট্রাম্পের মুখোমুখি আসনটি তিনি কীভাবে পেলেন ?
জয়শঙ্কর উত্তর দেন, “অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যে কিছুটা সম্মান পাবেন, সেটি তো স্বাভাবিক।”
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মোদি ও ট্রাম্পের ‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সমীকরণকে তারা আবারও গুরুত্ব দিতে চাইছেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলবে বলে ভারত মনে করছে। নতুন মার্কিন প্রশাসনে যে ‘একটি উদ্দীপনা ও প্রাণশক্তির উপস্থিতি’ দেখা যাচ্ছে, তারও প্রশংসা করেছেন জয়শঙ্কর। মোদী ৩.০ যে ট্রাম্প ২.০-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করার জন্য প্রস্তুত।
ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক প্রভু চাওলা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “আমি মনে করি না যে এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো গুরুত্ব রয়েছে। ট্রাম্প আসলে ভারতকে বোঝাতে চাইছেন যে, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করো এবং অন্য দেশের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্কের বিষয়টি ভুলে যাও – নইলে ফল ভোগ করতে প্রস্তুত থাকো। এখন যদি ভারত দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে এই জটিল ভারসাম্যের খেলা পরিচালনা করতে পারে, তাহলে তা ইতিবাচক হবে। তবে ভারত কতটা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারবে, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই!”
এই
প্রসঙ্গে একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরে চাওলা আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচনে বিজয়ের দুই সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প ব্রিকস দেশগুলোকে সতর্ক করেন – যদি তারা ডলারের পরিবর্তে একটি ‘ব্রিকস কারেন্সি’ প্রবর্তনের চেষ্টা করে, তাহলে তিনি ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোতে ১০০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করবেন।
ব্রাজিল, চীন, রাশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো অন্যান্য সদস্য দেশগুলো এই সতর্কতা নিয়ে বিশেষ কিছু মন্তব্য না করলেও, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেন, ভারত কখনোই বিশ্ব অর্থনীতিকে ডলার-মুক্ত করার পক্ষে নয় এবং বর্তমানে একটি ‘ব্রিকস কারেন্সি’ চালুর কোনো প্রস্তাবও নেই!
ভারত শুরু থেকেই ট্রাম্পকে কোনোভাবে বিরক্ত করতে চায়নি, তা এই বক্তব্যে স্পষ্ট। আরেকটি বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নতুন প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোর জন্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত বা ‘প্র্যাকটিসিং হিন্দু’দের নাম প্রস্তাব করেছেন, যা ভারতে ব্যাপক আবেগ ও উৎসাহের সৃষ্টি করেছে।
যদি এই মনোনয়নগুলো চূড়ান্ত হয়, তাহলে তুলসী গ্যাবার্ড মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক হবেন, কাশ প্যাটেল এফবিআই-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন, স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বে আসবেন জয় ভট্টাচার্য এবং ‘এআই জার’ হিসেবে কাজ করবেন শ্রীরাম কৃষ্ণান। সরকারি বিভাগগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য গঠিত নতুন ডিপার্টমেন্টের প্রধান নেতা হিসেবে বিবেক রামস্বামীর নামও ঘোষণা করা হয়েছিল, তবে তিনি ওই পদে থাকবেন কিনা, নাকি ওহাইও অঙ্গরাজ্যের গভর্নর হওয়ার জন্য লড়বেন, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
প্রভু চাওলা এই বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিতে চান না। তার মতে, “এরা ভারতীয় উত্সের হওয়ায় ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের আলোচনা করা এবং একে অপরকে বোঝা সহজ হবে। তবে মনে রাখতে হবে, তারা ভারতীয় নাম বা পেডিগ্রি ধারণ করলেও, তারা প্রথমত নির্ভেজাল ও আপসহীন আমেরিকান!”
এ
কারণে তার পর্যবেক্ষণ হলো, ‘আমেরিকার দাবি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ’ – ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতির সঙ্গে ভারত তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রেখে যতটা সম্ভব চলতে পারবে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতিপথও সেভাবেই নির্ধারিত হবে।
প্রভু চাওলার মতে, বাইডেনের ২০২১-২৪ সময়কাল ভারতের জন্য একটি নো-উইন-নো-লস পর্ব ছিল, অর্থাৎ লাভক্ষতি তেমন কিছু হয়নি। কিন্তু ট্রাম্পের ২০২৫-২৮ সময়কাল হতে যাচ্ছে ‘ডুয়েল টাইম’, যেখানে মুখোমুখি দ্বন্দ্বের পরিস্থিতি তৈরি হবে – যেখানে হারজিত একরকম অবধারিত!

0 Comments